শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ০৮:১১ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ:

মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে যত লীলাখেলা: অহিদুল ইসলাম

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২

বিশেষ প্রতিবেদন: 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বললেন মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল করা যাবে না,মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আবার বললেন মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল রাখার হাইকোর্টের রায় আছে,এটা বাতিল করলে আমি কোর্ট অব কনটেম এ পড়বো, অতঃপর তিনি জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বললেন যেহেতু কেউ কোটা চায় না তাহলে সকল কোটা বাতিল করা হলো।অতঃপর কোটা যুগের এখানেই সমাপ্তি হতে পারতো কিন্তু রবী ঠাকুরের ছোট গল্পের মতো শেষ হইয়াও হইলো না শেষ।

অতঃপর আন্দোলনকারীরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মুখের কথায় বিশ্বাস রাখতে পারলেন না,তারা লিখিত পরিপত্র চাইলেন।

অতঃপর কেবিনেট সেক্রেটারিকে প্রধান করে কোটা সংশোধন করার জন্য যে কমিটি আগেই গঠন করা হয়েছিল সেই কমিটির কাজ ছিল ভুক্তভোগী শ্রেণির নেতৃবৃন্দের সাথে বসে আলোচনা করে কোটা পদ্ধতি সংশোধন করে পরিপত্র জারি করা।না সেটা হলো না।তৎকালীন জনপ্রশাসন সচিব ফয়েজ আহমেদ স্বাক্ষরিত ৪ ই অক্টোবর, ২০১৮ সালে কোটা পদ্ধতি সংশোধন করে পরিপত্র জারি করা হলো।

কেবিনেট সেক্রেটারিসহ একাদিক সচিবদের নাম না প্রকাশ করে বিভিন্ন পত্রিকায় নিউজ হলো ১ম ও ২য় শ্রেণিতে কোটা বাতিল করা হয়েছে।দেশের মানুষসহ সবাই জানলো শুধু ১ম ও ২য় শ্রেণিতে কোটা বাতিল করা হয়েছে।

কিন্তু কোটা বাতিলের পরিপত্রে কি ছিল??
পরিপত্রে বলা হলো ৯ম গ্রেড (পূর্বতন ১ম শ্রেণি) এবং ১০ম-১৩তম গ্রেড (পূর্বতন ২য় শ্রেণি) পদে সরাসরি নিয়োগে কোটা বাতিল করা হলো এবং মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ করা হবে।তাহলে কোটা ধারীরা কি মেধাবী না?

আসলে তারা পূর্বতন শব্দ কেন ব্যবহার করলো?পূর্বতন বলতে কি বুঝিয়েছেন?
প্রকৃতপক্ষে ৯ম গ্রেড প্রথম শ্রেণি এবং শুধু ১০ম গ্রেড ২য় শ্রেণি, ১১-১৬ তম গ্রেড ৩য় শ্রেণি এবং ১৭-২০ তম গ্রেড চতুর্থ শ্রেণি। প্রকৃতপক্ষে তারা পূর্বতন শব্দটি ব্যবহার করে ৩য় শ্রেণির তিনটি পদও বাতিল করলেন।এর কারণ হলো ৩য় শ্রেণির ১১,১২ ও ১৩ তম গ্রেডের কিছু পদ আছে যেগুলো সচিবালয়ে নিয়োগ পেলে পদন্নোতি পেয়ে ব্যক্তিগত কর্মকর্তা,সহকারী সচিব,সিনিয়র সহকারী সচিব এবং উপ সচিব পর্যন্ত হতে পারে।
তাই মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা যাতে ১১,১২,১৩ তম গ্রেডে নিয়োগ পেয়ে এমন ভাইটাল পদে না যেতে পারে সেজন্য ৩য় শ্রেণির কিছু পদে কোটা বাতিল করা হয়েছে।খুব কৌশলী একটা পরিপত্র ছিল।

মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য রইল ১৪ -২০ তম গ্রেডের চাকরি।কৌশল শেষ নয়,সবচেয়ে বেশি কর্মচারী নিয়োগ হয় প্রাথমিক শিক্ষা খাতে,শিক্ষকরা আন্দোলন করলো, মাত্র দুই দিন আন্দোলন করার পরই তাদের গ্রেড ১৫ থেকে ১৩ তম গ্রেডে উন্নীত হলো কিন্তু ১৩ম গ্রেডেও নিয়ম অনুযায়ী কোটা থাকার কথা না কিন্তু ৪৫ হাজার সহকারী শিক্ষকের নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান যেখানে নারী, পোষ্য ও বিজ্ঞান কোটা থাকলেও নেই মুক্তিযোদ্ধা কোটা।আমি সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম মহোদয়কে বললাম নারী কোটা রইল আমাদের কোটা নাই কেন? উনি উত্তর দিলেন যে গুলো আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত সে গুলো সরকারকে রাখতে হয়, তাহলে ১৩ তম গ্রেডও গেলো।
১৪তম (১০২০০ টাকা স্কেল) গ্রেডের কর্মচারীদের পদবী ছিল উচ্চমান সহকারী তাদেরকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা বানিয়ে গ্রেড উন্নীত করার কাজ শেষ পর্যায়ে তার মানে ১৪ গ্রেডেও কোটা বাতিল হলো।বাকী রইল ৯৩০০-৮২০০ টাকা স্কেলের পদ গুলো অর্থাৎ পিওন,চাপরাশি, মালি,ঝাড়ুদার বানানোর পদ গুলো।

ঘটনা শেষ হয়নি
সরকার বলল ৩য় ও চতুর্থ শ্রেণির নিয়োগ প্রক্রিয়া পিএসসি নিবে কিন্তু মন্ত্রণালয় এতে রাজি না,পরিপত্র জারি করল ৩য় ও চতুর্থ শ্রেণির নিয়োগ কার্যক্রম সম্পূর্ণ করবে নিজ নিজ দপ্তর এবং টেন্ডারের মাধ্যমে অন্য কাউকে দেওয়া যাবে না।
আরেকটা শুভংকরের ফাঁকি। এ শ্রেণির চাকরি গুলো দেওয়া হয় বেশিরভাগ মুখ দেখে,লবিং এ অথবা দুর্নীতির মাধ্যমে। শুরু থেকেই বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিবার অসচ্ছল। ৩য় ও চতুর্থ শ্রেণির নিয়োগে ৫/৭/১০ টা ভাইভা দিয়েও চাকরি পাচ্ছে না মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা কারণ তাদের লবিং নাই,টাকাও নাই।তার মানে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও প্রজন্মের জন্য কিছু রইল না।প্রচারে রয়ে গেলো কোটা আছে,চাকরি পাচ্ছে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও প্রজন্মরা।

ঘটনা শেষ হতে পারতো হলো না।এটা যে শুধু মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের আন্দোলন ছিল,এখানে যে শুধু ছাত্র ছাত্রীরা জড়িত ছিল তা না, এখানে সরকারের অনেক আমলারা ও রাজনীতিবিদরাও যে জড়িত ছিল তা স্পষ্ট হলো বিভিন্ন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে।গত ৩/৪ বছরের অনেক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে দেখা গেলো ৯ম-১৩তম গ্রেডে কোটা না থাকার কথা না থাকলেও ১০,১১,১২,১৩ তম গ্রেডে নারী,পোষ্য,জেলা কোটা বহাল আছে, নেই শুধু মুক্তিযোদ্ধা কোটা।

প্রশ্ন হলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহান জাতীয় সংসদে বললেন সকল কোটা বাতিল করা হলো কিন্তু সচিব কমিটি ১৪ম-২০ তম গ্রেডে পিওন,ঝাড়ুদার, চাপরাশি,বার্তাবাহক বানানোর জন্য মুক্তিযোদ্ধা কোটা কেন রাখলেন?এর পেছনে একটা কারণ আছে তা হলো অন্যান্য বৈষম্যসহ প্রশাসনিক মুক্তির জন্যও বীর মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধে গিয়েছিলেন।অর্থাৎ পূর্ব বাংলার জনগণের জন্য পাকিস্তান আমলে কেরানি, চাপরাশি, সৈনিক পদ গুলোর কিছু সংরক্ষিত ছিল আর ১ম শ্রেণির পদ গুলো পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য আর তার থেকে মুক্তির জন্য মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছেন এবং যুদ্ধ করে যে অপরাধ করেছেন তার শাস্তি স্বরূপ তাদের প্রজন্মের জন্য কেরানি বানানোর পদ গুলো রাখা হয়েছে।
কারণ যুদ্ধের সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ আমলারা পাকিস্তান সরকারের অনুগত ছিলেন,মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি,বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তারা প্রতিবাদ না করে মোশতাক মন্ত্রী সভার আনুগত্য স্বীকার করেছেন অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী মনোভাব এবং পাকিস্তানের অনুগত মনমানসিকতা হয়তো অনেক আমলার মাঝে এখনো বহমান।

অতঃপর সমাহিত হলো বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান,শ্রেণি বিন্যাস করে বানানো হলো চতুর্থ শ্রেণির নাগরিক। অবমাননা করা হলো সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদ এবং ১১১ নং অনুচ্ছেদের।

শেষ হলো না,মুক্তিযোদ্ধাদের অযোগ্য, মেরুদণ্ডহীন কিছু সন্তানদের মদদ দিতে লাগলো কমিটি বাণিজ্য করতে,পরিবারকে এলোমেলো করে দিতে,এবং মুক্তিযোদ্ধা সন্তানরা যে মেধাহীন তা প্রমাণে চেষ্টা করাতে লাগলো পেছন থেকে।অতঃপর কালো মেঘে ডেকে গেলো মুক্তিযুদ্ধের আকাশ।

লেখক
অহিদুল ইসলাম
সভাপতি
মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও প্রজন্ম
কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল।

 

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2018 News Smart
ডিজাইন এন্ড ডেভেলপমেন্ট MetroNews71